ইসলামের দৃষ্টিতে পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্ব

লেখকঃ মাওলানা মোঃ নাসির উদ্দিন হেলালী

ভূমিকা:
মানব সমাজের ভিত্তি পরিবার স্বামী-স্ত্রীকে কেন্দ্র করে যা গঠিত হয়। আদম-হাওয়া (আ.) এর মাধ্যমে মানব জাতির পরিবার গড়ে ওঠে। সৃষ্টির সূচনালগ্নে আদম (আ.) ও পরিবারের প্রবর্তন হয়। সারা পৃথিবীর মধ্যে পরিবার হচ্ছে “দুনিয়ার জান্নাত” যেখানে সবাই শান্তি, নিরাপত্তা খোঁজে। যদি পরিবারে নির্মল-সুখ, শান্তি, স্নেহ, মমতা, ভালবাসা, সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ না থাকে তবে জীবনে সুখ-শান্তি আসে না। সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ একক হলো পরিবার। সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা পরিবার নির্ভর। পরিবার ভেঙ্গে গেলে সমাজে নেমে আসে নানাবিধ অস্থিরতা ও অরাজকতা। তাই শান্তি-শৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজ গঠনে একটি সুস্থ পরিবার গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন দাবি রাখে।

পরিবারের পরিচিতি:
দাদা-দাদি, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি নিয়ে গঠিত হয় পরিবার। পরিবারের সংজ্ঞায় Oxford ইংরেজি অভিধানে বলা হয়েছে, A group consisting of one or two parents and their children. অর্থাৎ, পরিবার হলো পিতা ও মাতার উপর ও তাদের সন্তান-সন্ততির সমষ্টি।

পরিবারের সূচনা:
মানবজাতির প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) ও প্রথম মানবী হাওয়া (আ.) কে কেন্দ্র করে মানবজাতির প্রথম পরিবার গড়ে উঠেছিল পৃথিবীতে। এই প্রথম পরিবারের সদস্য হযরত আদম (আ.) কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে আদম! তুমি তোমার স্ত্রীসহ জান্নাতে বসবাস করো এবং সেখান থেকে যেখান থেকে ইচ্ছা আহার করো; কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না। তাহলে তোমরা সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।” (সূরা বাকারাহ আয়াত: ৩৫) কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় তারা মহান রাবের নির্দেশের অবাধ্যতা প্রদর্শন করেন।

এই পরিবার থেকেই মানবজাতি পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে মহান আল্লাহ পাক বলেন “হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ভয় কর। যিনি তোমাদেরকে একটি প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দু’জন থেকে বহু পুরুষ ও মহিলা বিস্তার করেছেন।” তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট কিছু চাও এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে সতর্ক হও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর সদা সতর্ক অভিভাবক। (সূরা নিসা আয়াত: ০১)

পরিবারের গুরুত্ব প্রয়োজনীয়তা:
পরিবার মানব সমাজের মূল ভিত্তি। পারিবারিক জীবন ব্যতিত মানব সভ্যতা কল্পনা করা যায় না। মানুষের অস্তিত্বের জন্য পারিবারিক জীবন অপরিহার্য। সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা, উন্নতি-অগ্রগতি ইত্যাদি সুষ্ঠু পারিবারিক ব্যবস্থার উপর অনেকখানি নির্ভরশীল। পারিবারিক জীবন অবনত ও নষ্টচরিত্রে হলে, তাহলে ভাঙন ও বিপথগামিতা দেখা দিলে সমাজ জীবনে নানা অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে থাকে। তাই বলা যায়, পারিবারিক বন্ধন হচ্ছে কল্যাণকর সমাজের ভিত্তি। সুস্থভাবে একটি সমাজ গঠনের জন্য পরিবার অপরিহার্য। যারা আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ পরিবার গঠন ও পরিচালনা করবে, তারাই প্রকৃত অর্থে সমাজের শান্তি ও সমৃদ্ধি আনতে সক্ষম হবে।
আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস: ১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এক বিশেষ প্রস্তাব গৃহীত হয়, ১৫ মে তারিখকে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে প্রতি বছর ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস পালিত হয়ে আসছে। পরিবারে আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, মমতা, ভালোবাসা, সৌন্দর্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে এ দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। সুখী, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পারিবারিক জীবন-ই সমাজের উন্নয়ন ও সাফল্যের চিত্র। আজ গ্রাম-গঞ্জে এবং শহরের জীবনে দেখা যাচ্ছে, পারিবারিক বন্ধনের চিত্র অনেকটা বিবর্ণ। আধুনিকতার অজুহাতে অনেকে পরিবার থেকে দূরে সরে গিয়ে পারিবারিক বন্ধনকে ছিন্ন করে এখন অনেকেই বিধ্বস্ত পথে পা বাড়াচ্ছে।

পরিবারে বললেই মনে হয় মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি, চাচা-চাচী, ফুফু সবাইকে নিয়ে একসাথে বসবাস। যা কেবলই সুন্দর জাতিগত পরিবার। পরিবারের গুরুত্বের কিছু দিক তুলে ধরার চেষ্টা করি—

মানব সংখ্যা বৃদ্ধি:
পরিবারের মাধ্যমেই মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। মহান আল্লাহ পাক বলেন, “আর আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন।” অর্থাৎ তোমাদের জোড়া যুগল সৃষ্টি করেছেন, পয়গম্বরীয় সৃষ্টি কার্যক্রম এবং তাদের পরবর্তী বংশধরদেরকে যুগল অবস্থায় রেখেছেন।”

এভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আর উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধিকারক ভালোবাসার সমূহ সমাজের আল্লাহই ওয়াসাল্লাম এর প্রেরিত বিষয় হবে, হাদীসে এসেছে—

عن مَعقِلِ بنِ يسارٍ قال: جاءَ رَجلٌ إلى النَّبيِّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم فقالَ إنِّي أصبْتُ امرَأةً ذاتَ حسبٍ وجَمالٍ إلَّا أنَّها لا تَلِدُ أفَأتزوَّجُها؟ فنهاهُ، ثمَّ أتاهُ الثَّانيةَ فنهاهُ، ثمَّ أتاهُ الثَّالثةَ فقالَ تزوَّجوا الوَدودَ الوَلودَ فإنِّي مُكاثِرٌ بِكُمُ الأُمَمَ

মাক্কি ইবনে ইয়াসার (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, আমি এক সুন্দরী ও বংশীয় নারীকে বিয়ে করতে চাই, কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিবাহ করব? তিনি বললেন না। লোকটি তিনবার প্রশ্ন করলে তৃতীয়বার তিনি বললেন, “তোমরা সেই নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হও, যে সন্তান জন্মদানকারী ও প্রেমময়ী হবে। কেননা আমি তোমাদের অধিক সংখ্যার কারণে গর্ব করব।” (সুনানে আবি দাউদ, হাদীস নং- ২০৫০)

মানববন্ধন সংরক্ষণ:
পরিবারের মাধ্যমেই মানব বন্ধন রক্ষা হয়। মহান আল্লাহ পাক বলেন, “তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে যুগল অবস্থায় করেছেন।” অন্যদিকে তিনি আরো বলেছেন যে, বিবাহিত সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন। আর বিবাহের মাধ্যমেই

“পরিবারসমূহ” (সূরা ফুরকান আয়াত : ৫৪) এ পরিবারের সদস্যদের মাঝে আছে-স্বামী-স্ত্রী, মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি ইত্যাদি হয়। তাদের পরস্পরের মধ্যে থাকে সম্পর্কের সুদৃঢ় বন্ধনসূত্র। কারণ স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, দাদা-দাদি, চাচা-চাচী, খালা-খালু, ফুফু-ফুপা প্রমুখ পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ। নারী-নারীর দান-দানার মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয়। পারিবারিক সম্পর্কের মাধ্যমেই মানব বন্ধন রক্ষা পায়।

পারিবারিক সম্পর্ক পৃথিবী থেকে রক্ষা:
ইসলামে পারিবারিক বন্ধনকে একটি ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক বিষয় হিসেবে রক্ষা করা হয়। কেননা পারিবারিক বন্ধন রক্ষার মাধ্যমেই মানব সমাজ টিকে থাকে। মহান আল্লাহ পাক বলেন, “আল্লাহই আয়াত দিয়ে বিবাহিত যুগল সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা পরস্পরের সাথে সখ্যতা স্থাপন করতে পারো।” (সূরা রুম আয়াত : ২১)

পারিবারিক বন্ধন রক্ষায় বৈষয়িক লাভ:
বর্তমান সমাজে দেখাযায় পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা বিবেকবান করে পরিবার-পরিজনকে অগ্রাহ্য চলে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্ক রক্ষাকারীদের জন্য বৈষয়িক কল্যাণের সুসংবাদ দান করেছেন।

عن أنس بنِ مالكٍ، أنَّ رسولَ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم قالَ: “مَن أحبَّ أن يُبسَطَ له في رزقِهِ، ويُنسَأَ له في أثرِه، فليصِلْ رَحِمَهُ”
আনাস ইবন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিজিক প্রসারিত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি হোক, সে যেন আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ণ রাখে।” (সহিহ বুখারী, হাদিস নং- ৫৯৮৬)

ধর্মের নামে বিচ্ছিন্নতা নয়:
ইসলাম পারিবারিক-পরিজনের বিচ্ছিন্ন জীবন অনুমোদন করে না। এমনকি আল্লাহর অধিক ইবাদতের জন্য পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার অনুমতিও নেই। ওমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) বলেন ইসলামী বেহেশতের মূলনীতি হলো: “বিয়ে করলেই মানুষ পরিপূর্ণ কল্যাণ ও হেদায়াত থেকে বঞ্চিত হয় না।” (ফিকহুস সুন্নাহ: ৩/৬৩)

কষ্ট হলেই পরিবার থেকে দূরত্ব নয়:
পারিবারিক জীবনে নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। ভুল বোঝাবুঝি ও মতভেদ দেখা দেয় এবং দেখা দেয় ক্ষণস্থায়ী মনোমালিন্য। এসব সমস্যাগুলো উভয়পক্ষ পারিবারিক জীবনের নির্দেশনা ও মহানবীর আদর্শ অনুসারে সমাধান করে নিলে জীবনে শান্তি আসবে। আল্লাহ বলেন, “যদি তারা একে অপরের সাথে বিরোধ করে, তবে আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য কল্যাণ রেখেছেন। তোমরা তা সম্পর্কে সচেতন কর।” (সূরা নিসা আয়াত : ১৯)

 

উপসংহার:

পরিবারের সুখের অনেক দিক: মনস্তাত্ত্বিক, আধ্যাত্মিক, শিক্ষামূলক ইত্যাদি। পরিবারের সদস্যদের বড় দাযিত্ব শিশুকে সমাজিক করে তোলা এবং ইসলামী থোঁতা-আত্মায় শিশুদের শিক্ষা দান। পরিবারের বাধা এবং সান্নিধ্য শিশুর ভিশ্ব এবং পরিবারের ভালো দৃঢ়স্থল বড়ো ভুমিকা পালন করে।

পরিবারের মূল চাকুরী থাকে পিতা-মাতা, তাদের কাজ সন্তানের ভালো থাকা, তাদের প্রশিক্ষণ এবং সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করবে যাতে পরিবারের ছোট এবং বড় সদস্যদের ভালো অনুভূতি থাকে।

পরিবারের উপকারিতা ৫টি, পরিবারের সদস্যরা যখন আলাদা দায়িত্ব সম্পাদন করে ভালো থাকবেন, শ্রদ্ধাশীল আদর্শিক পথে তাঁদের কর্মের শিরোমণি পিতা-মাতা মান্যতা দিয়ে শিশুদের জীবনকে পথপ্রদর্শন করতে সাহায্য করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *